মাগুরায় গুদামে পর্যাপ্ত সার, তবু কৃষকের হাতে মিলছে না টিএসপি-ডিএপি

প্রকাশিত: ১২:৪৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৮, ২০২৬

আমন মৌসুমের ব্যস্ত সময়ে মাগুরার বিভিন্ন এলাকায় প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জেলায় চাহিদার ভিত্তিতে সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং সরকারি গুদামগুলোতেও রয়েছে পর্যাপ্ত মজুদ। ডিলারদের পক্ষ থেকেও বরাদ্দের সার পুরোপুরি উত্তোলনের দাবি করা হয়েছে। তবে মাঠের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।

কৃষকদের অভিযোগ, বিশেষ করে টিএসপি ও ডিএপি সার প্রয়োজনের সময় পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও চাহিদার তুলনায় কম সার দেওয়া হচ্ছে। আবার অতিরিক্ত দামে সার পাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। ফলে সরকারি গুদাম থেকে ডিলারদের মাধ্যমে উত্তোলন করা সার শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) মাগুরার ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মো. আজম উদ্দিন জানান, জেলায় মোট আবাদযোগ্য জমি ৮১ হাজার ৭৬২ হেক্টর। চলতি আমন মৌসুমে ৬১ হাজার ৯৫৫ হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে ইউরিয়ার চাহিদা ৪ হাজার ৫৭৫ মেট্রিক টন, টিএসপি ৭৩৫ মেট্রিক টন, ডিএপি ৮৩৭ মেট্রিক টন এবং এমওপি ৭৬৩ মেট্রিক টন। জুলাই মাসের জন্য চাওয়া ৪ হাজার ৯১১ মেট্রিক টন সারও চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ পাওয়া গেছে। সেপ্টেম্বরের বরাদ্দও পাওয়া গেছে এবং কৃষি মন্ত্রণালয় আগাম সার উত্তোলনের নির্দেশনা দিয়েছে।

তবে কৃষি কর্মকর্তার দাবি, সার সংকট নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাননি তারা।

সরকারি হিসাবের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার মিল পাচ্ছেন না কৃষকেরা। মাগুরা সদর উপজেলার ইসলামবাগ এলাকার কৃষক ঈদুল জানান, তিনি ছয় বিঘা জমিতে আমন আবাদ করেছেন। কয়েক দিন ধরে সার খুঁজলেও ডিলারের কাছে প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না। তাঁর অভিযোগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি টাকা দিলে সার পাওয়া যায় বলেও জানানো হচ্ছে।

একই উপজেলার বাগডাঙ্গা এলাকার কৃষক শিতিরঞ্জন বলেন, তাঁর প্রয়োজন ছিল টিএসপি ও ডিএপি। কিন্তু ডিলারের কাছে গিয়ে তিনি জানতে পারেন এসব সার নেই। পরে অল্প পরিমাণ সার দেওয়া হলেও সঙ্গে ইউরিয়া ও পটাশ নেওয়ার কথা বলা হয়। তাঁর প্রশ্ন, প্রয়োজনের সময় প্রয়োজনীয় সার না পেলে কৃষকেরা চাষাবাদ করবেন কীভাবে?

অন্যদিকে সরকারি গুদামের তথ্য বলছে, মাগুরায় সার মজুদের ঘাটতি নেই। বিএডিসির উপসহকারী পরিচালক (সার) বি. এম. মাহমুদ হাসান জানান, মাগুরার গুদামে বর্তমানে ৫ হাজার ৪ দশমিক ৪১ মেট্রিক টন টিএসপি, ৪ হাজার ৪৫৩ দশমিক ৪৭ মেট্রিক টন ডিএপি এবং ৫৩৬ দশমিক ৬০ মেট্রিক টন এমওপি রয়েছে। বিসিআইসির হিসাব অনুযায়ী, ২৭ আগস্ট পর্যন্ত জেলায় ইউরিয়া মজুদ ছিল ১ হাজার ৭১২ মেট্রিক টন।

উপসহকারী পরিচালক (সার) এস. এম. মাহবুবুর রহমান জানান, মাগুরা ও ঝিনাইদহ জেলার ২১০ জন ডিলার গত ছয় মাসে প্রায় ২৬ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন সার বরাদ্দ পেয়েছেন। বরাদ্দের পুরো পরিমাণই তারা উত্তোলন করেছেন বলেও জানান তিনি।

এদিকে লক্ষীকান্তপুর এলাকার খুচরা বিক্রেতা মো. আসলাম হোসেনের ভাষ্য, ডিএপি ও টিএসপির চাহিদা সবচেয়ে বেশি হলেও সব সময় সেই অনুপাতে বরাদ্দ পাওয়া যায় না। ফলে অন্য ধরনের সার মজুদ থাকলেও প্রয়োজনীয় সার না থাকায় বাজারে সংকটের পরিস্থিতি তৈরি হয়।

সার ডিলার মেসার্স শিকদার ইন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. টিপু শিকদারের দাবি, ডিলারদের বরাদ্দ বাড়ানো হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তাঁর ভাষ্য, তাঁদের পক্ষ থেকে নিয়ম মেনেই সার বিতরণ করা হচ্ছে।

অনিয়মের অভিযোগে আগেও অভিযান

মাগুরায় সার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। গত ২৩ আগস্ট জাগলা বাজারে মেসার্স সাগর ট্রেডার্সে অভিযান চালায় উপজেলা প্রশাসন। মাগুরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুন্নাহার জানান, ভেজাল ডিএপি বিক্রির অভিযোগে চালানো অভিযানে দুই বস্তা ভেজাল সার পাওয়া যায়। পরে সার ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৬-এর ১৭ ধারায় প্রতিষ্ঠানটিকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযোগকারী কৃষককেও সারের দাম ফেরত দেওয়া হয়।

এর আগেও বিভিন্ন সময়ে মাগুরায় বিপুল পরিমাণ সার জব্দ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর খানপাড়া এলাকা থেকে ১৪০ বস্তা, ২৪ ডিসেম্বর গাংনালিয়া বাজারের কাছ থেকে ৫৪৯ বস্তা এবং ২০২৬ সালের ৩ মার্চ বারাসিয়া বাজার এলাকা থেকে আরও ২৯ বস্তা সার জব্দ করা হয়। জব্দ করা এসব সার পরে কৃষকদের কাছে সরকারি নির্ধারিত দামে বিক্রি করা হয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বরাদ্দ পাওয়া সার যথাসময়ে উত্তোলন না করায় মেসার্স শেখ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শেখ শফিকুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় উপজেলা কৃষি অফিস। এতে সময়মতো সার উত্তোলন না করায় কৃষকদের মধ্যে বিতরণ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

প্রশ্ন উঠছে বিতরণব্যবস্থা নিয়ে

সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত মজুদ, চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ এবং ডিলারদের শতভাগ সার উত্তোলনের তথ্যের পরও কৃষকদের হাতে প্রয়োজনীয় সার না পৌঁছানোর বিষয়টি নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

কৃষকদের দাবি, আমন চাষের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে টিএসপি ও ডিএপির মতো প্রয়োজনীয় সার সহজলভ্য করতে হবে। একই সঙ্গে বরাদ্দ থেকে শুরু করে ডিলার পর্যায় এবং খুচরা বাজার পর্যন্ত পুরো বিতরণব্যবস্থা কঠোরভাবে তদারকির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

এখন মূল প্রশ্ন—সরকারি গুদাম থেকে ডিলারদের কাছে পৌঁছানোর পর সার যদি যথাযথভাবে উত্তোলন করা হয়ে থাকে, তাহলে মাঠপর্যায়ে সংকট তৈরি হচ্ছে কেন? কোথাও কি বিতরণব্যবস্থায় অনিয়ম হচ্ছে, নাকি চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে? আমন মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মাগুরার কৃষকদের জন্য এর কার্যকর উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।