৯৯ পেরিয়েও থামেনি আব্দুল বারীর সাইকেল, পেটের দায়ে ছুটছেন গ্রাম থেকে গ্রামে অনুসন্ধান প্রতিদিন অনুসন্ধান প্রতিদিন প্রকাশিত: ৫:১৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩১, ২০২৬ বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে। হাঁটাচলায়ও কষ্ট হয়। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। তবুও থেমে নেই আব্দুল বারীর জীবনসংগ্রাম। প্রতিদিন ভোর হলেই জরাজীর্ণ ঘর থেকে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। সাইকেলের সঙ্গে বাঁধা থাকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ঘুরে ভাঙা হাঁড়ি-পাতিলের কান্দা ও কড়াইয়ের হাতল মেরামত করে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে তার জীবন। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার মোমিনপুর ইউনিয়নের কবিখালী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল বারী। নিজের বয়স তিনি দাবি করেন ১১৬ বছর। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য বলছে, তার জন্ম ১৯২৭ সালের ২০ এপ্রিল। সেই হিসাবে ২০২৬ সালের আগস্টে তার বয়স প্রায় ৯৯ বছর। স্থানীয়দের ধারণা, জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির সময় বয়সের তথ্য সঠিকভাবে নথিভুক্ত না হওয়ার কারণেই এমন পার্থক্য তৈরি হয়েছে। তবে তার বয়স নিয়ে মতভেদ থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে কঠিন জীবনযাপন করে আসার বিষয়টি স্থানীয়দের কাছে অজানা নয়। সম্প্রতি কবিখালী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ছোট একটি টিনের ঘরে একাই বসবাস করছেন আব্দুল বারী। ঘরের টিন অনেক পুরোনো। বিভিন্ন স্থান দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। ঘরের ভেতরেও নেই তেমন কোনো আসবাব বা স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা। প্রয়োজনীয় কয়েকটি জিনিসপত্র নিয়েই চলছে তার দিন। এই বয়সেও জীবিকার জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতে চান না তিনি। প্রতিদিন সকালে সাইকেল নিয়ে বের হয়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ান। কোথাও হাঁড়ি-পাতিলের কান্দা খুলে গেলে তা মেরামত করেন, আবার কোথাও কড়াইয়ের হাতল লাগানোর কাজ পান। কাজ মিললে কিছু টাকা আয় হয়, আর কাজ না পেলে খালি হাতেই ফিরতে হয় বাড়িতে। আব্দুল বারী জানান, তার স্ত্রী অনেক বছর আগে মারা গেছেন। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। তারা নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। ছেলে সন্তান নেই। ফলে শেষ বয়সে এসে নিজের দেখভাল তাকেই করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, “এখনো নিজের কাজ নিজেই করি। কষ্ট হয়, কিন্তু ক্ষুধা তো আর থেমে থাকে না। খাবারের জন্যই কাজে বের হতে হয়।” নিজের শৈশব ও পারিবারিক জীবনের কথা বলতে গিয়ে আব্দুল বারী জানান, তার পৈতৃক বাড়ি কুষ্টিয়ার হালসা কুসা মল্লিকপুর এলাকায়। তিনি মৃত তাসের মল্লিকের ছেলে। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি একজন। বিয়ের পর ঘরজামাই হিসেবে চুয়াডাঙ্গার কবিখালী গ্রামে আসেন। শ্বশুরের জমিতেই গড়ে ওঠে তার বর্তমান বসতি। সময়ের সঙ্গে পরিবারের অনেক সদস্যই মারা গেছেন। স্ত্রীও নেই বহু বছর ধরে। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে আলাদা সংসার হয়েছে। ছেলে না থাকায় জীবনের শেষ সময়ে এসে অনেকটাই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন তিনি। দীর্ঘ জীবনের রহস্য জানতে চাইলে আব্দুল বারীর উত্তরও বেশ সরল। তিনি বলেন, তার শরীরে বড় কোনো রোগ নেই। আল্লাহ তাকে এতদিন বাঁচিয়ে রেখেছেন। এখনো নিজের রান্না নিজেই করেন, হাঁড়ি-পাতিল পরিষ্কার করেন এবং সুযোগ পেলেই কাজ করে আয় করেন। স্থানীয় বাসিন্দা এনামুল হক, ফজর আলী ও রাহেন আলী জানান, ছোটবেলা থেকেই তারা আব্দুল বারীকে দেখে আসছেন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি অনেকটাই একা। প্রতিদিন সকালে সাইকেল নিয়ে বের হয়ে বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে হাঁড়ি-পাতিল মেরামতের কাজ করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, বয়সের কারণে আগের মতো শক্তি নেই তার। সাইকেল চালাতেও এখন বেশ কষ্ট হয়। কিন্তু ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই। কারণ দিনের আয় দিয়েই অনেক সময় দিনের খাবারের ব্যবস্থা করতে হয়। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একজন মানুষের যেখানে নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত খাবার ও স্বজনের সঙ্গ পাওয়ার কথা, সেখানে আব্দুল বারীর বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। জরাজীর্ণ ঘর, একাকীত্ব এবং অনিশ্চিত আয়ের মধ্যেই কাটছে তার দিন। ভোরে যখন অধিকাংশ মানুষ দিনের কাজ শুরুর প্রস্তুতি নেন, তখন আব্দুল বারীর দিন শুরু হয় জীবিকার সন্ধানে সাইকেল নিয়ে পথে নামার মধ্য দিয়ে। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও থামেনি তার প্যাডেল। ক্ষুধার তাগিদে প্রতিদিনই তাকে পাড়ি দিতে হয় গ্রামের পর গ্রাম। আব্দুল বারীর গল্প শুধু একজন প্রবীণের দারিদ্র্যের গল্প নয়; এটি বার্ধক্যেও জীবিকার জন্য লড়াই করে যাওয়া অসংখ্য মানুষের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। জীবনের দীর্ঘ সময় কাজ করার পরও শেষ বয়সে নিরাপদ আশ্রয় ও নির্ভরতার নিশ্চয়তা না পাওয়ার নির্মম চিত্র ফুটে ওঠে তার জীবনসংগ্রামে। 📸 Download News PhotoCard (1080×1080) SHARES সারাবাংলা বিষয়: