মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার: ‘কলিং ভিসা’র নামে সক্রিয় দালালচক্র, সতর্ক কর্মীরা

প্রকাশিত: ১১:৫১ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর আবারও সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে। দুই দেশের সরকারের উদ্যোগে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন করে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরুর প্রস্তুতি চললেও এরই মধ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি চক্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কে ‘কলিং ভিসা’, ‘কোটা’, ‘ভিসা রেডি’, ‘ডিমান্ড লেটার’ ও ‘মালয়েশিয়ার কোম্পানির চাকরি’—এমন নানা আকর্ষণীয় শব্দ ব্যবহার করে কর্মী সংগ্রহের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

কর্মসংস্থানের আশায় থাকা সম্ভাব্য কর্মীদের কাছ থেকে আগাম মোটা অঙ্কের টাকা চাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অথচ দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় নতুন কর্মী নিয়োগে মধ্যস্বত্বভোগীদের কোনো সুযোগ না রাখার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।

মালয়েশিয়ার নির্ধারিত পদ্ধতি অনুযায়ী, দেশটির নিয়োগকর্তাকে বাংলাদেশে অনুমোদিত ২৬টি রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্য থেকে একটি এজেন্সি নির্বাচন করতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা।

এ অবস্থায় একজন সম্ভাব্য কর্মীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রকৃত নিয়োগকর্তা কে, চাকরিটি কোন খাতে, বেতন কত, অনুমোদিত কোটা রয়েছে কি না এবং বাংলাদেশে কোন বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে নিয়োগ হচ্ছে—এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া।

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এসব মৌলিক তথ্যের পরিবর্তে অনেক কর্মীর কাছে ঘুরছে ‘ভিসা’, ‘কোটা’ ও ‘ডিমান্ড’ কেনাবেচার নানা খবর। ফলে নিয়োগ নিশ্চিত হওয়ার আগেই যারা টাকা দিয়ে দিচ্ছেন, শেষ পর্যন্ত তাদের কী হবে—তা নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

‘বডি’ ও ‘পাসপোর্ট’ হিসেবে কর্মী গণনা

মালয়েশিয়ার কর্মী নিয়োগের ভিসাকে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ‘কলিং ভিসা’ নামে প্রচার করা হয়ে আসছে। এর পাশাপাশি ‘কয়টা মাথা’, ‘কয়টা বডি’, ‘কয়টা যাত্রী’ কিংবা ‘কয়টা পাসপোর্ট’—এ ধরনের শব্দও প্রচলিত হয়েছে।

শ্রম অভিবাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন কর্মী কোনো পণ্য নন যে তাকে ‘বডি’ বা ‘পাসপোর্ট’ হিসেবে গণনা করা হবে। কিন্তু বাস্তবে কর্মী নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়ায় অনেক ক্ষেত্রে মানুষের বদলে সংখ্যা, পাসপোর্ট ও অর্থের হিসাবই প্রাধান্য পাচ্ছে। এতে কর্মীদের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ

বিদেশে কর্মসংস্থানে প্রতারণা ও অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধে বর্তমান সরকার যে লক্ষ্যগুলো সামনে রেখেছে, তার অন্যতম হলো বিনা মূল্যে বা স্বল্প ব্যয়ে কর্মী পাঠানো। মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রেও ‘শূন্য অভিবাসন ব্যয়’ নীতির সঙ্গে বাংলাদেশের এই উদ্যোগের সামঞ্জস্য রয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বোয়েসেলের মাধ্যমে ১০ হাজার কর্মীকে কোনো ধরনের অর্থ ব্যয় ছাড়াই মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি ব্যবস্থায় ১০ হাজার কর্মী বিনা খরচে গেলেও বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে যাওয়া কর্মীদের ক্ষেত্রেও একই নীতি কার্যকর হবে কি না।

অতীতের ‘সিন্ডিকেট’ নিয়ে বিতর্ক

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে এর আগের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, অনিয়ম ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ উঠেছিল। চাহিদাপত্র ও ভিসা সংগ্রহের পর বাংলাদেশে কর্মী প্রক্রিয়াকরণে সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির ভূমিকা নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়।

আন্দোলন, মামলা এবং দুই দেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের পর ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের সঙ্গে নেতিবাচকভাবে জড়িয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকার ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করে। এ নিয়ে নিম্ন ও উচ্চ আদালতে একাধিক মামলাও চলমান রয়েছে।

তবে অভিযোগ রয়েছে, ভিসা ও পাসপোর্ট কেনাবেচার পুরোনো প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

দালালের ওপর নির্ভরশীল কর্মীরা

বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র ও ক্ষমতা পেলেও উপযুক্ত কর্মী সংগ্রহের ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীরা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।

বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সির হয়ে অনেক ক্ষেত্রে দালালরা কর্মী সংগ্রহ থেকে শুরু করে বিমানবন্দরে তুলে দেওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন কাজ করেন। ফলে বিদেশে থাকা কর্মীদের রিক্রুটিং এজেন্সির নাম জানতে চাইলে অনেকেই এজেন্সির বদলে দালালের নাম বলতে পারেন।

অভিযোগ তদন্তের সময় এমন ঘটনাও পাওয়া গেছে, যেখানে কোনো কর্মী সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির নাম বলতে পারেননি; তিনি শুধু যে দালালের মাধ্যমে বিদেশে গেছেন তার নাম বলতে পেরেছেন।

রিক্রুটিং এজেন্সির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গ্রামের অনেক যুবক শুরুতেই দালালের কাছে পাসপোর্ট দিয়ে দেন। অর্থের দরদামও সেখানেই ঠিক হয়। পাসপোর্ট দালালের হাতে থাকায় বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো চাইলেও অনেক সময় সরাসরি কর্মী সংগ্রহ করতে পারে না।

কুয়ালালামপুরে কর্মরত মোহাম্মদ তোফায়েলের অভিজ্ঞতাতেও একই চিত্র উঠে এসেছে। তার মতে, বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে অনেকেরই পর্যাপ্ত ধারণা নেই। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা দালালের ওপর নির্ভর করেন। দালাল পাসপোর্ট নিয়ে সব কাজ করে দেওয়ায় কর্মীরাও নিশ্চিন্ত থাকেন, যদিও এর বিনিময়ে তাদের অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়।

সরকারি ব্যবস্থার বিষয়ে অজ্ঞতা

সরকারি ডেমো অফিস, বিএমইটি কিংবা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা সম্পর্কে অনেক কর্মীই পর্যাপ্ত তথ্য জানেন না বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

তাদের অনেকের ধারণা, সরকারি অফিসে গেলে চাকরি পাওয়া যাবে না; বরং বিদেশে চাকরি এনে দিতে পারে দালালই। এই ধারণাই মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অভিবাসন নিয়ে কাজ করা সংস্থা ওকাপের গবেষণায় দেখা গেছে, তুলনামূলক কম শিক্ষিত ও বিদেশে কাজের জন্য প্রস্তুতিহীন ব্যক্তিরাই দালালের মাধ্যমে বেশি অর্থ ব্যয় করেন এবং প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। অন্যদিকে সচেতন ও দক্ষ কর্মীরা তুলনামূলক কম খরচে বৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশ যেতে পারেন।

রামরুর পর্যবেক্ষণেও বলা হয়েছে, যারা অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পর্কে কম জানেন এবং জানার আগ্রহও কম, তারা দালালের ওপর বেশি নির্ভর করেন। তাদের বড় একটি অংশ চান, দালাল যেন ‘সবকিছু করে দেয়’। ফলে তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

২৬ এজেন্সির সঙ্গে ৪২৩ সহযোগী এজেন্সি

দালালদের জবাবদিহির আওতায় আনতে সরকার সাব-এজেন্ট স্বীকৃতির বিধান করলেও সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত কোনো রিক্রুটিং এজেন্সি আনুষ্ঠানিকভাবে সাব-এজেন্ট নিয়োগ করেনি।

অন্যদিকে লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে ‘অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটিং এজেন্সি’ ব্যবস্থার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার জন্য নির্ধারিত ২৬টি রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে ৪২৩টি অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটিং এজেন্সিকে যুক্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ব্যবস্থা কার্যকরভাবে চালু করা গেলে অনিয়ন্ত্রিত মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

কীভাবে হবে নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া?

মালয়েশিয়ার প্রকাশিত নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য প্রথমে নিয়োগকর্তাকে দেশটির সরকারের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে। এরপর বিদেশি কর্মীর কোটা নির্ধারণ এবং বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি নির্দিষ্ট করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

পরবর্তী ধাপে বাংলাদেশে কর্মী বাছাই ও মেডিকেল পরীক্ষা হবে। নিয়োগকর্তার কাছে কর্মী পাঠানোর আগে তাকে নিজ দেশেই অবস্থান করতে হবে। মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন অনুমোদনের পর বাংলাদেশে মালয়েশিয়ান দূতাবাস থেকে প্রবেশ ভিসা এবং বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স নিয়ে কর্মী মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করবেন।

নতুন ব্যবস্থায় অর্থের বিনিময়ে কৃত্রিমভাবে কর্মী বাছাই কিংবা কোনো কর্মীকে জোর করে নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার কাছে পাঠানোর সুযোগ না রাখার কথা বলা হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতিতে নিয়োগকর্তা সরাসরি কর্মীর সাক্ষাৎকার নিয়ে তাকে নির্বাচন করবেন।

তাহলে নিয়োগকর্তার সাক্ষাৎকারের আগেই কোনো দালালকে টাকা দিয়ে ‘ভিসা নিশ্চিত’ করার যৌক্তিকতা কোথায়—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

আগাম টাকা না দেওয়ার পরামর্শ

সম্ভাব্য কর্মীদের চূড়ান্ত নিয়োগ নিশ্চিত হওয়ার আগে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন, পাসপোর্ট হস্তান্তর কিংবা অপ্রয়োজনীয় মেডিকেল পরীক্ষায় না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।

কারণ, নিয়োগকর্তা শেষ পর্যন্ত কোনো কর্মীকে নির্বাচন না করলে আগাম দেওয়া অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা কী—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন করে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে প্রকৃত নিয়োগকর্তা, অনুমোদিত কোটা, বেতন, কর্মক্ষেত্র, বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি এবং মোট অভিবাসন ব্যয়ের তথ্য। একই সঙ্গে অননুমোদিত দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিদেশে নিরাপদ কর্মসংস্থানের জন্য কর্মীদের বৈধ প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন হওয়াও জরুরি। তথ্য যাচাই করতে নিকটস্থ ডেমো অফিস অথবা টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে (টিটিসি) যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে নতুন এই উদ্যোগ দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের অনিয়ম, অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য আবার ফিরে এলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কর্মীরাই। একই সঙ্গে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার সহযোগিতাও।

এখন দেখার বিষয়, সরকারের ঘোষিত নতুন ব্যবস্থা সত্যিই কি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে মধ্যস্বত্বভোগীমুক্ত, স্বচ্ছ ও স্বল্প ব্যয়ের করে তুলতে পারে, নাকি পুরোনো কায়দায় আবারও ‘কলিং ভিসা’র নামে মানুষের স্বপ্নের বেচাকেনা শুরু হয়।