উল্টে যাওয়ার ১৬ মাস পর কমিশনড উত্তর কোরিয়ার আধুনিক ডেস্ট্রয়ার

প্রকাশিত: ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬

উত্তর কোরিয়া তাদের দ্বিতীয় আধুনিক গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ‘কাং কোন’ আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশন করেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে পানিতে নামানোর সময় দুর্ঘটনায় জাহাজটি উল্টে যাওয়ার পর মেরামত শেষে এর কমিশনিংকে দেশটির নৌ সক্ষমতা বৃদ্ধির পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে তুলে ধরেছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন।

রোববার অনুষ্ঠিত কমিশনিং অনুষ্ঠানে কিম বলেন, ‘কাং কোন’-এর যাত্রা শুরু উত্তর কোরিয়ার আত্মমর্যাদা, দৃঢ়তা ও সংকল্পের প্রতিফলন। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, কিম দাবি করেছেন—পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম এই যুদ্ধজাহাজ উত্তর কোরিয়ার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

দুর্ঘটনার পর ঘুরে দাঁড়ানো

২০২৫ সালের মে মাসে ‘কাং কোন’কে পানিতে নামানোর সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জাহাজটির পেছনের অংশ নির্ধারিত সময়ের আগেই পানিতে পড়ে যায়। এতে জাহাজটির কাঠামোর একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সামনের অংশ নির্মাণপথে আটকে যায়।

ঘটনার পর কিম জং উন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি দুর্ঘটনাটিকে ‘অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরে উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রাথমিক আশঙ্কার তুলনায় জাহাজটির ক্ষয়ক্ষতি কম এবং এটি দ্রুত মেরামত করা সম্ভব হবে।

দুর্ঘটনার প্রায় ১৬ মাস পর সেই একই যুদ্ধজাহাজের কমিশনিং উত্তর কোরিয়ার জন্য প্রতীকী গুরুত্ব বহন করছে।

উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ

‘কাং কোন’ হলো চোয়ে হিয়ন শ্রেণির দ্বিতীয় ডেস্ট্রয়ার। প্রায় ৫ হাজার টন ওজনের এই শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ উত্তর কোরিয়ার নৌবাহিনীতে নির্মিত সবচেয়ে বড় ও আধুনিক যুদ্ধজাহাজগুলোর মধ্যে রয়েছে।

এই শ্রেণির প্রথম ডেস্ট্রয়ার জুন মাসে কমিশন করা হয়। সে সময় কিম জং উন দাবি করেছিলেন, নতুন যুদ্ধজাহাজটি উত্তর কোরিয়ার সামরিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তাঁর ভাষায়, এর মধ্য দিয়ে দেশটির নৌবাহিনীতে দীর্ঘদিনের স্থবিরতার অবসান ঘটছে।

রোববারের অনুষ্ঠানে কিম আবারও বলেন, ‘কাং কোন’-এর কমিশনিং উত্তর কোরিয়ার নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।

নৌবাহিনীকে পারমাণবিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা

দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় উত্তর কোরিয়ার প্রচলিত নৌ সক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত। আধুনিক যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন, উন্নত ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতায় দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের নৌবাহিনী অনেক এগিয়ে।

তবে কিম জং উন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর কোরিয়ার নৌবাহিনীকে আরও আধুনিক ও পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিত বাহিনীতে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

রোববার কিম জানান, উত্তর কোরিয়ার পূর্ব উপকূলে নতুন নৌঘাঁটি নির্মাণ করা হচ্ছে। সম্প্রসারিত নৌবহরের যুদ্ধজাহাজগুলো এসব ঘাঁটিতে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও তিনি জানান।

বছরে দুটি নতুন যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের নির্দেশ

দেশটির জাহাজ নির্মাণ কারখানাগুলোকে বছরে অন্তত দুটি নতুন সারফেস যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের আহ্বান জানিয়েছেন কিম। ভবিষ্যতে আরও বড় আকারের যুদ্ধজাহাজ, এমনকি চোয়ে হিয়ন শ্রেণির ডেস্ট্রয়ারের প্রায় দ্বিগুণ আকারের ক্রুজার নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও তিনি তুলে ধরেছেন।

এ ছাড়া উত্তর কোরিয়া একটি বড় পারমাণবিক শক্তিচালিত অ্যাটাক সাবমেরিন নির্মাণ করছে বলে দাবি করেছে। দেশটির ভাষ্য অনুযায়ী, সাবমেরিনটি আকারে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ব্যবহৃত অ্যাটাক সাবমেরিনগুলোর কাছাকাছি হতে পারে।

গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ছবিতে কিম জং উনকে একটি নির্মাণস্থলে ওই সাবমেরিনের অভ্যন্তরীণ অংশ পরিদর্শন করতে দেখা যায়।

‘আট মাস পর বিশ্বকে প্রমাণ করব’

কমিশনিং অনুষ্ঠানে কিম বলেন, উত্তর কোরিয়া নৌবাহিনীর শক্তি বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। তিনি ইঙ্গিত দেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই এই সক্ষমতার আরও দৃশ্যমান প্রমাণ সামনে আসতে পারে।

কিমের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘আবারও আট মাস পর বিশ্বকে তা প্রমাণ করব’—এমন বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি সম্ভবত নতুন যুদ্ধজাহাজ বা নৌবাহিনীর আরও কোনো বড় সক্ষমতা প্রদর্শনের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

অনুষ্ঠানে কিমের মেয়েও

কমিশনিং অনুষ্ঠানে কিম জং উনের সঙ্গে তাঁর মেয়েকেও দেখা যায়। মেয়েটিকে সাধারণভাবে জু এ নামে উল্লেখ করা হলেও উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নাম প্রকাশ করেনি।

রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত ছবিতে তাকে কিমের সঙ্গে এবং যুদ্ধজাহাজটির ক্রুদের সঙ্গে দলীয় ছবিতে দেখা যায়। এর আগে বিভিন্ন সামরিক কর্মসূচিতেও কিমের মেয়ের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।

বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, কিম জং উন তাকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে ধীরে ধীরে জনসম্মুখে পরিচিত করে তুলছেন। সামরিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি সেই সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করছে বলে মনে করেন তাঁরা।